যে ৫টি হিসাব বিষয়ক চর্চা, শুরুর দিন থেকে করা দরকার ।

বেশির ভাগ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা মনে করেন যে, ব্যবসার হিসাব – নিকাশ একটু বড় হলে বা কয়েকদিন পর থেকে সংরক্ষন করলেই হবে । বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে ব্যবসা শুরুর সময় যে জনবল এর হিসাব করা হয় তার মধ্যে হিসাব –সংরক্ষন করার জন্য কোন জনবল হিসাব করা হয় না । ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য প্রথম দিন থেকেই হিসাব –সংরক্ষন করার জন্য আলাদা লোক রাখতে হবে বা রাখতে পারবে এমন আশা করাটাও উচিত নয় । তবে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে, উদ্যোগ যতোই ছোট হোক না কেন শুরুর দিন থেকেই কাউকে না কাউকে দায়িত্ব নিয়ে প্রতিটি টাকা-পয়সার পাই টু পাই হিসাব রাখতে হবে, তা নাহলে উদ্যোগ এবং বয়ে চলা নদীর মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য খুজে পাওয়া যাবে না মানে বয়ে চলা নদীকে যেমন কেও চাইলেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না ঠিক তেমনি আপনিও আপনার প্রতিষ্ঠান এর আর্থিক হিসাব – নিকাশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না । হ্যা করা সম্ভব তবে সেজন্য আপনাকে একটি বড় বাধঁ দিতে হবে যার জন্য যথেষ্ট খরচা – পাতি করতে হবে যা ক্ষুদ্র উদ্যোগ এর জন্য যথেষ্ট ব্যায় বহুল এবং সময় সাপেক্ষ্য বেপার ।

১/ বাজেট (আর্থিক পরিকল্পনা) কে সাথে নিয়ে উদ্যোগ শুরু করুন :
আপনি যদি কোন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার কাছে জানতে চান যে, আপনার উদ্যোগ এর মুলধন কতো বা আপনার উদ্যোগটি শুরু করতে কতো টাকা প্রয়োজন আমার ধারনা বেশিরভাগ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাই এর সঠিক জবাব দিতে পারবেন না । আমাদের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা উদ্যোগ এ বিনিয়োগ করেন অনেকটা “কাজের বিনিময়ে খাদ্য” এই মডেল এ অর্থাৎ প্রথমে কিছু বিনিয়োগ করেন এর পর যদি সেখান থেকে লাভ হয় তাহলে সেই লাভের টাকা আবার সেখানে বিনিয়োগ করেন আবার কেও কেও শুরুতে কিছু বিনিয়োগ করে, উদ্যোগ শুরু করেন এরপর লাভ নিশ্চিত হবার পর আবার বিনিয়োগ করেন । ফলে আসলে কতো টাকা বিনিয়োগ করে কতো টাকা লাভ হচ্ছে বা কতো টাকার উদ্যোগ পরিচালনা করছেন তার হিসাব বের করতে বেশ ঘাম ঝরাতে হয় । কিন্তু বিষয়টি হবার কথা ছিল উল্টো অর্থাৎ প্রথম দিনই আপনার উদ্যোগ এর পরিকল্পনা অনুযায়ী একটি বাজেট ( আর্থিক পরিকল্পনা) আপনার হাতে থাকার দরকার ছিল, যা আপনাকে বলে দিবে যে কোথায়, কখন , কত টাকা ব্যায় করতে হবে এবং কোথা থেকে কখন কি পরিমান টাকা আপনার লাভ হবার কথা ছিল । একটি উদ্যোগ এর বাজেট হলো সেই উদ্যোগ এর পুষ্টি সরবরাহ করার দিক নির্দেশনা প্রদান করার মুল নিয়ামক । এটি দেখেই উদ্যোক্তা বুঝতে পারবেন যে, কখন কোথায় কি পরিমান পুষ্টি মানে টাকা উদ্যোগ এর জন্য ব্যায় করতে হবে । একটি বাজেট একবার করার মানে এই না যে এটি আর সংশোধন, পরিমার্জন বিয়োজন, সংযোজন করা যাবে না । এটি সময়মতো অবশ্যই সংশোধন, পরিমার্জন বিয়োজন, সংযোজন করতে হবে এবং এর তথ্য আপনার কাছে আপডেটেড থাকতে হবে তবেই আপনার উদ্যোগ একটি শক্তিশালী উদ্যোগ এ পরিনত হবে।

২/ ক্যাশ টাকা থেকে দুরে থাকুন :
আমরা প্রায়শ শুনে থাকি যে, ”আমার উদ্যোগ এর টাকা কোথায় যায় আমি বুঝতে পারি না “ আবার কেও কেও বলেন “কোনটা আমার নিজের টাকা, আর কোনটা আমার উদ্যোগ এর টাকা” আমি বুঝতে পারি না” আবার কেও কেও বলেন “সারা মাস হাজার হাজার টাকা হিসাব করি কিন্তু মাস শেষে দেখি কোন টাকা নাই “
এ সব গুলোর কারন সমাধান করার সহজ একটাই উপায় আছে সেটা হলো নিচের দুইটি কাজ নিয়মিতভাবে চর্চা করা :
– ক্যাশ বুক ব্যবহার করা ( আপনার উদ্যোগে যতো ধরনের ক্যাশ টাকা লেন দেন হয় তা নিয়মিত এই বইতে লিখে রাখা )
– যত বেশি সম্ভব ক্যাশ লেনদেন না করা ( যতদুর সম্ভব ব্যাংক এর চেক এর মাধ্যমে লেনদেন করা /অন্য কোন মাধ্যম ব্যবহার করা )
ক্যাশ টাকা লেন দেন থেকে আপনি যতদুরে থাকবেন মানে আপনি আপনার উদ্যোগ এর লেন-দেনগুলো যতবেশি চেক বা অন্য মাধ্যমে ব্যবহার করবেন আপনার উদ্যোগ এর হিসাব-নিকাশ মেলাতে ততো সহজ হবে এবং অপচয় কমানো যাবে । আপনার হাতে যতো বেশি ক্যাশ থাকবে দেখবেন ততো বেশি আপনি খরচ করছেন আবার দেখবেন যতো বেশি আপনি নিয়মের মধ্যে দিয়ে খরচ করছেন ততো আপনার অপচয় কম হচ্ছে । তাই আমাদের ক্যাশ লেন-দেন কমিয়ে একটা নিয়মের মধ্যে দিয়ে চেক / অন্য মাধ্যম এ টাকা লেন দেন করতে হবে ।
৩/ দেনাদারের সাথে ভাল সর্ম্পক বজায় রাখুন :
আপনি যেদিন থেকে ব্যবসা শুরু করলেন সেদিন থেকেই আপনার উদ্যোগ এর সাথে দুটি শব্দ সংযুক্ত হয়ে যাবে প্রথম শব্দ হলো : দেনাদার ( আপনার কাছে টাকা পাবে) দ্বিতীয় শব্দ হলো : পাওনাদার ( আপনি উনার কাছে টাকা পাবেন ) আপনি যদি দ্বিতীয় দলের হন তাহলে বেশি আপনার দায়িত্ব হলো নিয়ম কানুন মেনে পাওনাদার হিসাবে টাকা আদায়ের ব্যবস্থা করা এটা যতনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনার কাছে যারা টাকা পাবে তাদের সাথে সব সময় এমন একটা ভাল সর্ম্পক বজায় রাখা কারন আপনার কাছে যে টাকা পাবে সে কোন না কোনভাবে আপনাকে নিশ্চয় উপকার করেছে হোক সেটা আপনাকে কোন পণ্য দিয়ে বা নগদ কোন টাকা সাহায্য করে । এখন অনেক কারনেই আপনি আপনার দেনাদারের পাওনা পরিশোধ করতে পারছেন না । অনেক সময় আমরা দেনাদার এর সাথে সর্ম্পক বজায় রাখাতো দুরের কথা দেনাদারের ফোন কল রিসিপ করতেই বিরক্তবোধ করি । উদ্যোগ টিকিয়ে রাখার জন্য হোক আর উদ্যোগকে চালিয়ে নেবার জন্য হোক যে কোন সময় আবার আপনার টাকা লাগতেই পারে, কে তখন আপনাকে টাকা দিবে ? এই দেনাদারই কিন্তু আপনাকে টাকা দিবে যদি আপনি তার সাথে ভাল সর্ম্পক বজায় রাখতে পারেন কারন এই দেনাদারই সেই লোক যে লোকের বিশ্বাস আপনি অর্জন করতে পেরেছেন এখন শুধু এই বিশ্বাসটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে মাত্র । কিন্তু আমরা এই দেনাদারদের কাছ থেকেই পালিয়ে বেড়াই, যারা কিনা আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু হতে পারে আমার উদোগ এর জন্য ।

৪/ কাগজকে, কাগজ না ভেবে টাকা মনে করুন :
আমরা আমাদের উদ্যোগ এর প্রয়োজনে সারাদিন নানাবিধ লেনদেন করে থাকি কখনও সেটা ক্যাশ আবার কখনও চেক বা অন্য কোন মাধ্যমে । কখনও পণ্য কিনি আবার কখনও পণ্য বিক্রি করি । আমরা যাই করি না কেন প্রতিটি কাজ এর বিপরীতে কিন্তু একটি করে কাগজ আমাদের কাছে জমা হয় । যেমন: আমরা যদি পণ্য/সেবা বিক্রয় করি তাহলে আমরা তাকে মানি রিসিপ দেই আবার আমরা যদি কোন পণ্য.সেবা ক্রয় করি তাহলে তারা আমাদের মানি রিসিপ দেয় এরকম নানা রকম কাগজ । একাউন্টস এর ভাষায় যাকে বলে লেন-দেন এর প্রমানপত্র ( Evidence ) সেই প্রমানপত্রগুলো কিন্তু আমরা সংরক্ষন করি না । ফলে আমরা দিন শেষে মনে করতে পারি না আসলে আমরা কত টাকা খরচ করলাম বা আয় করলাম । ফলে মাস শেষে এ সমস্যা আরো বড় হতে থাকে । আর এ কারনে কম পক্ষে দুটি ভাউচার ব্যবহার করা উচিত তাহলো ক্রেডিট এবং ডেবিট ভাউচার । আপনার উদ্যোগ এ কোন টাকা আয় হয় তাহলে ক্রেডিট ভাউচার এবং যদি কোন টাকা ব্যায় হয় তাহলে ডেবিট ভাউচার ব্যবহার করবেন । দেখবেন আপনার টাকা কোথায়, কিভাবে , কত টাকা আয় হচ্চে এবং ব্যায় হচ্ছে তা আস্তে আস্তে পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে । ফলে মাস শেষে টাকা কোথায় গেল বলে আর আপনাকে আহাজারী করতে হবে না আপনার ডকুমেন্টই বলে দিবে টাকা কোথা থেকে আসে কোথায় যায় ।
৫/ লেজার প্রিন্টার ব্যবহার না করলেও, হিসাবে সংরক্ষনে লেজার ব্যবহার করুন :
আমরা আমাদের উদ্যোগ বা প্রতিষ্ঠানে সবসময় ভাল মানের প্রিন্ট দেবার জন্য লেজার প্রিন্টার ব্যবহার করি ( এখন হয়তো আরো কোন প্রযুক্তি থাকতে পারে ) । ঠিক তেমনি আপনি আপনার উদ্যোগ এর ভাল-মন্দ বোঝার জন্যে একটি লেজার ( হিসাব সংরক্ষণ এর একটি ডকুমেন্ট এর নাম ) ব্যবহার করতে পারেন । এই ডকুমেন্টটি দেখে আপনি বুঝতে পারবেন আপনার প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যের অবস্থা কি ? এই ডকুমেন্টটি আপনাকে আপনার প্রতিষ্ঠানের আয়, ব্যায়, সম্পদ, দেনা –পাওনা ইত্যাদি এক নজরে দেখতে সহযোগীতা করবে অনেকটা আয়নার মতো । ফলে আপনি আপনার উদ্যোগ এর জন্য আর্থিক প্রয়োজনীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে সহযোগীতা করবে । এই ডকুমেন্টটি অনেকে সংরক্ষণ করতে চান না কারন এটি একটু এ্যাডভান্সড লেভেল এর হিসাব – সংরক্ষন প্রক্রিয়া বলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা মনে করেন । কিন্তু যে গরু দেয়, তার …………..একটু খেতেই হবে , যে ডকুমেন্টটি আপনাকে আপনার উদ্যোগ এর আর্থিক স্বাস্থ্য কেমন তা জানতে সহযোগীতা করবে আর তার জন্য আপনি একটু সময় বের করবেন না, তা কি করে হয় ! একটু সময় তো আপনাকে বের করতেই হবে আপনার উদ্যোগ এর সার্থ রক্ষার জন্য ।

মো: আমিনুল ইসলাম ।



2 Comments

Leave a Reply